সিএনএনের প্রতিবেদন

‘মার্কিন অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠছে গণতান্ত্রিক অবক্ষয়’

সংশোধিত পরিসংখ্যানের সঙ্গে দ্বিমত রয়েছে প্রশাসনের শীর্ষ কর্তার। তাই চাকরি থেকে বরখাস্ত হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানবিদ।

সংশোধিত পরিসংখ্যানের সঙ্গে দ্বিমত রয়েছে প্রশাসনের শীর্ষ কর্তার। তাই চাকরি থেকে বরখাস্ত হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানবিদ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীন নীতিগ্রহণ ও বাস্তবায়নের স্বাধীনতা বজায় থাকা নিয়েও রয়েছে বড় ধরনের সংশয়। বেসরকারি কোম্পানির মালিকানা কিনে নিচ্ছে ফেডারেল সরকার। একই সঙ্গে ভাগ বসাতে চাইছে কোম্পানির আয়প্রবাহেও। বাণিজ্য খাতে প্রেসিডেন্টের শুল্কবৃদ্ধির ক্ষমতার প্রয়োগ হচ্ছে অভূতপূর্ব মাত্রায়। লেটনাইট শোর হোস্টের বক্তব্য নিয়ে মিডিয়া কোম্পানিগুলোকে ধমকাচ্ছেন ফেডারেল নীতিনির্ধারকরা।

সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন বড় ধরনের গণতান্ত্রিক অবক্ষয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে দেশটির স্থানীয় সংবাদমাধ্যম সিএনএনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনের ভাষ্যমতে, গণতান্ত্রিক অবক্ষয়কেই এখন দেশটির অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী রাখতে কার্যকর গণতন্ত্রই সবচেয়ে উৎকৃষ্ট পন্থা। আর স্বল্পমেয়াদে কিছু আকর্ষণ তৈরি করলেও শেষ পর্যন্ত অর্থনীতিকে পিছিয়ে দেয় পপুলিজম বা জনতুষ্টিবাদী কর্মসূচির চর্চা ও গণতান্ত্রিক অবক্ষয়।

মার্কিন অর্থনীতিতে জনতুষ্টি সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠেছে বলে অভিমত অর্থনীতিবিদদের। তাদের ভাষ্যমতে, ঘটনাপ্রবাহ থেকে মনে হচ্ছে মার্কিন গণতন্ত্র এখন বড় ধরনের বিপত্তির দিকে যাচ্ছে। গণতান্ত্রিক পরিবেশের অবক্ষয় এখন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসা-বাণিজ্য খাত তথা সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্যকেই হুমকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

তবে অর্থনীতিবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের এমন আশঙ্কাকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করছেন হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র কুশ দেশাই। তার দাবি, ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রে আস্থা ও অর্থনৈতিক গতিশীলতা ফিরিয়ে আনছে। এর প্রমাণ হলো অ্যাপল, এনভিডিয়া, মার্কসহ বড় কোম্পানির ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি। কুশ দেশাই বলেন, ‘জো বাইডেনের কর্মকর্তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেন্সরশিপ চাপিয়ে দিয়েছিল, লক্ষাধিক অবৈধ অভিবাসী দেশে ঢুকেছিল এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বিচার ব্যবস্থা ব্যবহার হয়েছিল। ওই সময় সাধারণ মার্কিনদের ওপর কয়েক দশকের সবচেয়ে খারাপ মূল্যস্ফীতি চাপানো হয়েছিল। তখন এ রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা মুখ খোলেননি। ট্রাম্প প্রশাসন সরকারি ক্ষমতার বাড়াবাড়ি, অদক্ষতা ও অপব্যবহারকে সংশোধন করছে এবং আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে দ্রুতগতির প্রবৃদ্ধিবান্ধব অর্থনৈতিক নীতি বাস্তবায়ন করছে।’

২০২৩ সালে আমেরিকান ইকোনমিক রিভিউতে প্রকাশিত আরেক গবেষণা অনুসারে, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে জনতুষ্টিবাদী নেতাদের নেতিবাচক প্রভাব হয় দীর্ঘস্থায়ী। ১৯০০-২০২০ সালের মধ্যে ক্ষমতায় থাকা ৫১ জন পপুলিস্ট নেতার ওপর গবেষণা চালিয়ে দেখা গেছে, তাদের ক্ষমতায় থাকার দেড় দশক পরও সংশ্লিষ্ট দেশের মাথাপিছু জিডিপি পপুলিজম থেকে মুক্ত দেশের তুলনায় ১০ শতাংশ কম ছিল।

মার্কিন অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে গবেষণা সংস্থা ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সিনিয়র ফেলো ভ্যানেসা উইলিয়ামসন বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র নিয়ে আমি এতটা উদ্বিগ্ন কখনো হইনি। গণতন্ত্র অর্থনীতির জন্য ভালো। আর স্বেচ্ছাচারিতা অর্থনীতির জন্য খারাপ। স্বেচ্ছাচারী শাসকরা অর্থনীতি সামলাতে পারে না। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে নীতিনির্ধারণ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।’

ভ্যানেসা উইলিয়ামসনের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্রের ক্ষয় গত কয়েক বছর ধীরগতিতে ঘটলেও চলতি বছর তা দ্রুত ঘটছে। তিনি বলেন, ‘যে পরিস্থিতিকে আমি সম্ভাব্য সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি হিসেবে চিন্তা করছিলাম, আমরা এখন সেদিকেই যাচ্ছি।’

২০১৯ সালে প্রকাশিত জার্নাল অব পলিটিক্যাল ইকোনমির এক গবেষণা অনুসারে, জনতুষ্টিবাদীরা সাধারণত নিজেদের জনগণের প্রতিনিধি দাবি করে ক্ষমতায় আসে। কিন্তু তারা খুব কম ক্ষেত্রেই প্রতিশ্রুত অর্থনৈতিক সাফল্য দিতে পারে। বরং যেকোনো দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ অক্ষুণ্ন থাকলে মাথাপিছু জিডিপি দীর্ঘমেয়াদে প্রায় ২০ শতাংশ বাড়ে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে এসব দেশে পুঁজি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ে। অন্যদিকে জনতুষ্টিবাদী নেতাদের শাসনে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সমালোচনার প্রতি মার্কিন প্রশাসনের কঠোর দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বর্তমানে দেশটির করপোরেট খাতে বিরুদ্ধ মত এখন বিরল হয়ে উঠেছে। এ বিষয়ে ইয়েল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জেফ্রি সনেনফেল্ড বলেন, ‘আমরা গণতন্ত্রের ভিতের গুরুতর ক্ষয় দেখেছি। ব্যবসায়ী নেতারা গণতন্ত্রের অবস্থা নিয়ে খুবই চিন্তিত।’

স্বাধীন মুদ্রানীতি প্রণয়নে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভকে (ফেড) অনুসরণ করে থাকে বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ। সাম্প্রতিক সময়ে আর্থিক খাতের এ নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের আক্রমণের তীব্রতা বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত মাসে ফেড গভর্নর লিসা কুককে বরখাস্ত করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, যে বিষয়ের এখনো পুরোপুরি আইনি সুরাহা হয়নি। গত ১ আগস্ট শ্রমবাজার-সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর মনগড়া পরিসংখ্যান প্রকাশের অভিযোগ তুলে সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রধান ডাটা কমিশনার এরিকা ম্যাকএন্টারফারকে বরখাস্ত করেন ট্রাম্প। এ বিষয়ে এরিকা ম্যাকএন্টারফার বলেন, ‘এটি এমন একটি প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতার ওপর আঘাত, যা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ফেডের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।’

দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার ক্ষেত্রে বড় করপোরেটদের নিজের পক্ষে পেয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু সেখানেও হস্তক্ষেপ করেছেন তিনি। চীনের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে ইন্টেলের প্রধান নির্বাহী লিপ-বু ট্যানের পদত্যাগ দাবি করেন ট্রাম্প। পরে আবার তার প্রশংসা করেন এবং বিপর্যস্ত কোম্পানিটিতে ৮৯০ কোটি ডলারের সরকারি বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন।

এ বিষয়ে জর্জ ডব্লিউ বুশের সাবেক অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ও বর্তমানে আমেরিকান অ্যাকশন ফোরামের প্রেসিডেন্ট ডগলাস হোল্টজ-ইকিন বলেন, ‘আমরা সবসময় বিশ্বকে শেখাচ্ছিলাম রাষ্ট্রীয় মালিকানা অন্যায়। এখন ইন্টেল এক রাষ্ট্রীয় কোম্পানি। সরকার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।’

চলতি বছরের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন নিপ্পন স্টিলকে ইউএস স্টিল অধিগ্রহণের অনুমোদন দেয়। কোম্পানির সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের জন্য গোল্ডেন শেয়ার নামে মার্কিন সরকারের জন্য এক বিশেষ ক্ষমতা রাখা হয়েছে। এমপি ম্যাটেরিয়ালস নামে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ দুষ্প্রাপ্য খনিজ কোম্পানির সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডার এখন মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর।

বিষয়টি নিয়ে এখন ট্রাম্পের সাবেক ঘনিষ্ঠ সহযোগীরাও কথা বলছেন। এ বিষয়ে সতর্ক করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের সময় দায়িত্ব পালন করা সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স বলেছেন, ‘রাষ্ট্রীয় মালিকানা চীন ও রাশিয়ার মতো দেশে সাধারণ বিষয়। এসব দেশ গণতন্ত্র থেকে অনেক দূরে।’

আরও